বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও রক্তাক্ত অধ্যায়- ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান- এবার অন্তর্ভুক্ত হলো মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে। নতুন পাঠ্যবইগুলোতে উঠে এসেছে কোটা সংস্কার আন্দোলন, তা দমনে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও দেশত্যাগের ঘটনা।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাসও ফিরেছে পাঠ্যবইয়ের পাতায়।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রকাশিত ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বই ঘেঁটে দেখা গেছে, ইতিহাস, বাংলা সাহিত্য ও ইংরেজি- এই তিন বিষয়ের পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দিক তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বয়স ও বোধগম্যতা বিবেচনায় কোথাও সংক্ষিপ্ত পাঠ, কোথাও পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসা, একদলীয় শাসনের ধারা, বিরোধী মত দমন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং গণআন্দোলনের মুখে তার পতনের ধারাবাহিক ইতিহাস স্থান পেয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ অধ্যায়ে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ছবি ও বিবরণ পুনরায় যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পরদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও ঘোষণা দেন। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
একই বইয়ে নতুন অধ্যায় হিসেবে যোগ হয়েছে ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান’। এতে বাকশাল, স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিক বিবরণ রয়েছে। পাঠে সংযুক্ত হয়েছে শহীদ নূর হোসেনের ঐতিহাসিক ছবি এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করা ছবি।
এই অংশে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিবাদেই ২০২৪ সালের জুনে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, যা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মুখে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
সপ্তম শ্রেণির বাংলা বই সপ্তবর্ণা-য় হাসান রোবায়েতের কবিতা ‘সিঁথি’ যুক্ত করা হয়েছে। কবিতার পাঠ-পরিচিতিতে বলা হয়েছে, নির্মম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও জুলাই আন্দোলন মানুষকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছে। কবিতায় শিক্ষার্থী-জনতার আত্মত্যাগ ও রক্তপাতের চিত্র ফুটে উঠেছে।
অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘গণঅভ্যুত্থানের কথা’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনটি বড় গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে- ১৯৬৯, ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালে। এখানে ২০২৪ সালের আন্দোলনকে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সংগঠিত এক ঐতিহাসিক গণজাগরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির *বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়* বইয়ে কোটা আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহিংসতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামের নিহত হওয়ার ঘটনাও পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে ‘আমাদের নতুন গৌরবগাথা’ প্রবন্ধে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। কারফিউ উপেক্ষা করে মানুষের রাজপথে নামা, ব্যাপক প্রাণহানি এবং সরকারপ্রধানের দেশত্যাগ-সবকিছুই স্থান পেয়েছে এই পাঠে।
ইংরেজি বই English For Today-এ যুক্ত হয়েছে ‘Graffiti’ অধ্যায়। সেখানে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি, আবু সাঈদের মৃত্যু এবং তার মায়ের হৃদয়বিদারক উক্তি- ‘হামার বেটাক মারলু কেনে?’- অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মুঈনুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না। পাঠ্যবইয়ে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের সত্য উঠে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর বিকৃত ইতিহাস পড়ে বড় হবে না।”
তিনি বলেন, পাঠ্যবইয়ে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন, দমননীতি এবং ছাত্র-জনতার আজাদির লড়াই উঠে আসায় ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এনসিটিবি জানিয়েছে, ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট পাঠ্যবইয়ের ৮৪.৭৮ শতাংশ সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি বই ১৫ জানুয়ারির মধ্যে বিতরণ শেষ হবে।
এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম আসাদুজ্জামান জানান, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট ৩০ কোটি ২ লাখের বেশি বই মুদ্রণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের সব বই ইতোমধ্যে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের বইয়েরও অধিকাংশ মুদ্রণ ও সরবরাহ শেষ পর্যায়ে।
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এনসিটিবির ওয়েবসাইটে সব শ্রেণির ৬৪৭টি পাঠ্যবইয়ের অনলাইন সংস্করণ আপলোড করা হয়েছে।
নতুন কথা/এসআর
নিজস্ব প্রতিবেদক: 




















