ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
চীনের কাছেও হার, বিদায়ের শঙ্কায় বাংলাদেশ নারী দল গণভোট বাতিলের সঙ্গে জুলাই সনদের কোনো সম্পর্ক নেই: আইনমন্ত্রী ইরান ইস্যুতে হোয়াইট হাউস-পেন্টাগন দ্বন্দ্ব, যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন সংকটের আভাস কুষ্টিয়ায় ১৮ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু, হামের উপসর্গে উদ্বেগ বাড়ছে একদিনে দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত, হরমুজ অঞ্চলে উত্তেজনা জনবল সংকটে অচল আইসিইউ, রাজশাহী বিভাগে বাড়ছে সংকট, চাপের মুখে রামেক শ্রীলঙ্কার কাছে অপ্রত্যাশিত হার, কঠিন সমীকরণে বাংলাদেশ হকি দল কুষ্টিয়ায় হামে আক্রান্ত হয়ে আট মাস বয়সী শিশুর মৃত্যু ২০০ টাকার নিচে নেই মাছ, ঈদের পরও চাপে নিত্যপণ্যের বাজার হাজারীবাগে ভাড়া বাসা থেকে ঢাবি শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার

এক দশক পর আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার শুরু

প্রায় এক দশক অপেক্ষার পর অবশেষে মিয়ানমারের ধর্মীয় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার বিচার শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক ফোরাম ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজি)। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আদালত ‘বৈশ্বিক আদালত’ নামেও পরিচিত।

সোমবার নেদারল্যান্ডসের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) মামলার শুনানি শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলবে এই শুনানিপর্ব।

রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলাটি যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, তা নিশ্চিত করেছেন জাতিসংঘের তদন্তকারী সংস্থা ইউএন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার (IIMM)- এর প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান। তিনি বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানান, দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রমাণ সংগ্রহের পর অবশেষে বিচারিক শুনানি শুরু হচ্ছে।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি পুলিশ স্টেশন ও সেনা স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলার দায় সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা)- এর ওপর চাপায় মিয়ানমার সরকার।

এরপরই ‘নিরাপত্তা অভিযান’-এর নামে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এ অভিযানে নির্বিচারে হত্যা, নারী ও শিশুদের ধর্ষণ, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া ও লুটপাট চালানো হয়।

এই সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে, সে সময় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন, যারা এখনও শরণার্থী হিসেবেই জীবনযাপন করছেন।

রোহিঙ্গাদের ওপর সেনা অভিযানের পর জাতিসংঘ একটি স্বাধীন অনুসন্ধানী দল গঠন করে। তদন্ত শেষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যামূলক তৎপরতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। সোমবার শুরু হতে যাওয়া শুনানি মূলত সেই মামলাকেন্দ্রিক।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের সময় মিয়ানমারের বেসামরিক সরকারের প্রধান ছিলেন নোবেলজয়ী অং সান সুচি। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তিনি দাবি করেছিলেন, অভিযোগগুলো ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’। গাম্বিয়ার করা মামলাকেও তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে অস্বীকার করেছিলেন।

তবে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সুচির সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। বর্তমানে তিনি মিয়ানমারের কারাগারে বন্দি এবং সেনা-নিয়ন্ত্রিত আদালতে দুর্নীতিসহ একাধিক অভিযোগে তার বিচার চলছে।

আইসিজিতে দায়ের করা এই মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা নিকোলাস কৌমজিয়ান রয়টার্সকে বলেন,
“এই মামলার মাধ্যমে গণহত্যার আইনি সংজ্ঞা, অভিযোগ প্রমাণের মানদণ্ড এবং এ ধরনের অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথনির্দেশ স্পষ্ট হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিচার শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

 

নতুন কথা/এসআর

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের কাছেও হার, বিদায়ের শঙ্কায় বাংলাদেশ নারী দল

এক দশক পর আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার শুরু

আপডেট সময় ১১:৪৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

প্রায় এক দশক অপেক্ষার পর অবশেষে মিয়ানমারের ধর্মীয় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার বিচার শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক ফোরাম ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজি)। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আদালত ‘বৈশ্বিক আদালত’ নামেও পরিচিত।

সোমবার নেদারল্যান্ডসের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) মামলার শুনানি শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলবে এই শুনানিপর্ব।

রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলাটি যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, তা নিশ্চিত করেছেন জাতিসংঘের তদন্তকারী সংস্থা ইউএন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার (IIMM)- এর প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান। তিনি বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানান, দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রমাণ সংগ্রহের পর অবশেষে বিচারিক শুনানি শুরু হচ্ছে।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি পুলিশ স্টেশন ও সেনা স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলার দায় সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা)- এর ওপর চাপায় মিয়ানমার সরকার।

এরপরই ‘নিরাপত্তা অভিযান’-এর নামে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এ অভিযানে নির্বিচারে হত্যা, নারী ও শিশুদের ধর্ষণ, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া ও লুটপাট চালানো হয়।

এই সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে, সে সময় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন, যারা এখনও শরণার্থী হিসেবেই জীবনযাপন করছেন।

রোহিঙ্গাদের ওপর সেনা অভিযানের পর জাতিসংঘ একটি স্বাধীন অনুসন্ধানী দল গঠন করে। তদন্ত শেষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যামূলক তৎপরতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। সোমবার শুরু হতে যাওয়া শুনানি মূলত সেই মামলাকেন্দ্রিক।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের সময় মিয়ানমারের বেসামরিক সরকারের প্রধান ছিলেন নোবেলজয়ী অং সান সুচি। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তিনি দাবি করেছিলেন, অভিযোগগুলো ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’। গাম্বিয়ার করা মামলাকেও তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে অস্বীকার করেছিলেন।

তবে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সুচির সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। বর্তমানে তিনি মিয়ানমারের কারাগারে বন্দি এবং সেনা-নিয়ন্ত্রিত আদালতে দুর্নীতিসহ একাধিক অভিযোগে তার বিচার চলছে।

আইসিজিতে দায়ের করা এই মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা নিকোলাস কৌমজিয়ান রয়টার্সকে বলেন,
“এই মামলার মাধ্যমে গণহত্যার আইনি সংজ্ঞা, অভিযোগ প্রমাণের মানদণ্ড এবং এ ধরনের অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথনির্দেশ স্পষ্ট হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিচার শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

 

নতুন কথা/এসআর