উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং ও বিনামূল্যে বই বিতরণসহ নানা কর্মসূচির ফলে নব্বইয়ের দশকের পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এক যুগের বেশি সময় ধরে দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় শতভাগে পৌঁছালেও গুণগত শিক্ষার মান নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিত থেকেও অনেক শিশু মৌলিক পাঠ, গণিত ও ইংরেজিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এই শিখন ঘাটতি দূর করে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত শক্ত করতে মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার।
মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার চিরাচরিত ধারা থেকে বেরিয়ে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দিকে যেতে প্রাথমিক শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে আধুনিক ‘জিআরআর’ বা গ্র্যাজুয়াল রিলিজ অব রেসপনসিবিলিটি মডেল। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক ধীরে ধীরে শেখানোর দায়িত্ব নিজের কাছ থেকে সরিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে শিখতে সক্ষম করে তোলেন। শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় শেখার প্রকৃত মান যাচাই ও উন্নয়ন সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জিআরআর মূলত এমন একটি শিক্ষণ ও মূল্যায়ন কাঠামো, যেখানে ‘আমি করি, আমরা করি, তুমি একা করো’- এই তিন ধাপে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়া এগোয়। এতে প্রথমে শিক্ষক নিজে পড়ে শোনান, এরপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একসঙ্গে পাঠ অনুশীলন করেন, পরে সহপাঠীদের সঙ্গে জুটিতে পড়ে শেখে এবং সবশেষে শিক্ষার্থী কোনো সহায়তা ছাড়াই নিজে নিজে পড়তে শেখে। চার ধাপে সাজানো এই পদ্ধতির লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে শিক্ষকের সহায়তা কমিয়ে শিক্ষার্থীর আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলা।
চলতি বছর থেকেই প্রাথমিক শিক্ষায় এই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে চায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) যৌথভাবে এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিতব্য এক বৈঠকে নতুন মানবণ্টন ও মূল্যায়ন কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, কিছু নোট ও গাইড ব্যবসায়ী- যারা আগের মানবণ্টন অনুযায়ী বই ছাপার প্রস্তুতি নিয়েছেন- এই প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২১ ডিসেম্বর এনসিটিবির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি চিঠি পাঠান। সেখানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকার একটি গাইডলাইন যুক্ত করা হয়, যেখানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির মূল্যায়ন কাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আগে নেপ ২০২৬ সালের বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনায় জিআরআর মডেল ও বহুমুখী সহশিক্ষা কার্যক্রম চালুর একটি বিস্তারিত রূপরেখা দেয়।
নেপের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন মানবণ্টনের আওতায় পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দুর্বলতা চিহ্নিত করা সহজ হবে। শিশুদের শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং স্বাধীনভাবে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই হবে এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য। এজন্য শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের সরব পাঠ, অংশগ্রহণমূলক পাঠ, জুটিতে পড়া এবং স্বাধীন পাঠ—এই চার ধরনের পঠন কার্যক্রম চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রারম্ভিক স্তরে পড়তে শেখা এবং পরবর্তী স্তরে পড়ে শেখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সরবরাহ করা হবে সম্পূরক পঠন সামগ্রী বা এসআরএম। গল্পের বইসহ বিভিন্ন সহায়ক বইয়ের মাধ্যমে শিশুদের পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে এসব বই ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট রেজিস্টার রাখা ও ‘বুক ক্যাপ্টেন’ নিয়োগের নির্দেশনাও থাকবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ১০টিরও বেশি সহশিক্ষা কার্যক্রম পাঠ পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ শিক্ষা, ছড়া-গান-কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, একক অভিনয়, সুন্দর হাতের লেখা, ইংরেজি কথোপকথন, উপস্থিত বক্তৃতা এবং দলভিত্তিক বিজ্ঞান মেলার আয়োজন উল্লেখযোগ্য।
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আহসান কালবেলা বলেন, প্রাথমিক স্তরে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতা অনেক বাড়বে। তবে নতুন পাঠ পরিকল্পনা কার্যকর করতে শিক্ষকদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করাও বড় চ্যালেঞ্জ, যার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা দেবে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, নতুন মানবণ্টনে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখা, দক্ষতা ও প্রয়োগ ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে পড়ালেখার ভয় কমে গিয়ে শিশুদের শেখার প্রতি আগ্রহ ও আনন্দ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রাথমিক শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আনবে। আজ এ নিয়ে বৈঠক রয়েছে। সব পক্ষের সম্মতি মিললে চলতি বছর থেকেই এই নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে।
নতুন কথা/এসআর
নিজস্ব প্রতিবেদক: 



















