ঢাকা ০৭:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পবিত্র লাইলাতুল বরাতের রজনী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে চট্টগ্রাম-৪ আসনে আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন : আপিল বিভাগ নির্বাচনে বিএনসিসি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ভারতকে হারিয়ে ফাইনালের পথে বাংলাদেশ তারেক রহমানের জনসভায় লোকে লোকারণ্য, উৎসবের নগরীতে রূপ নিল যশোর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় দ্বিতীয় দিনের মতো সাক্ষ্য দিচ্ছেন ব্রিগেডিয়ার আযমী আজ খুলনা-যশোরে তারেক রহমান, জনসভা ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি বিএনপির বেলুচিস্তানে ৪০ ঘণ্টার সাঁড়াশি অভিযান: নিহত ১৪৫ বিচ্ছিন্নতাবাদী, নজিরবিহীন দাবি সরকারের মিসাইল হাতে আকাশে শাকিব, ঈদে ‘প্রিন্স’ হয়ে ঝড় তুলতে আসছেন ঢালিউড কিং ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করে বিশ্বকাপে খেলবে পাকিস্তান

আমদানি নিষিদ্ধের পথে সরকার, পোল্ট্রি শিল্পে সিন্ডিকেট আতঙ্ক

দেশের পোল্ট্রি খাতে আবারও সিন্ডিকেট আতঙ্ক ভর করেছে। সক্ষমতা যাচাই না করেই এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার- এমন খবরে উদ্বিগ্ন খামারি ও খাত- সংশ্লিষ্টরা। ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর চূড়ান্ত খসড়ায় বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালনের জন্য এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খামারিদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের ওপর। একই সঙ্গে বাজারে গুটিকয়েক বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার ঝুঁকিও বাড়বে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক দশকে দেশের পোল্ট্রি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যেখানে মুরগির সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬৮৪ লাখ, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩৬১ লাখে। হাঁসসহ মোট পোল্ট্রির সংখ্যা এখন চার হাজার ৬৬ লাখের বেশি। এই বিশাল উৎপাদন ব্যবস্থার বড় অংশই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্নভাবে এক দিন বয়সী বাচ্চা সরবরাহের ওপর। সামান্য ছন্দপতন হলেই পুরো উৎপাদন চক্রে প্রভাব পড়ে।

সরকারের বক্তব্য, দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর করতে আমদানিনির্ভরতা কমানোই নতুন নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য। তবে খাত–সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবে সেই সক্ষমতা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। তাদের মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই আমদানি বন্ধ করা হলে বাজারে হঠাৎ বাচ্চা সংকট তৈরি হবে, যার চাপ সরাসরি পড়বে ছোট ও মাঝারি খামারিদের ওপর।

নীতিমালার খসড়া অনুযায়ী, এক দিন বয়সী বাণিজ্যিক মুরগির বাচ্চা আমদানির অনুমতি থাকবে না। তবে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। সংকট দেখা দিলে ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ প্যারেন্ট স্টক আমদানির অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ শব্দবন্ধ নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খামারিরা বলছেন, কোন পরিস্থিতিকে প্রয়োজনীয় ধরা হবে, কে সিদ্ধান্ত নেবে এবং কত দ্রুত অনুমোদন মিলবে—এসব বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে সংকটের সময় প্রশাসনিক জটিলতা ও লালফিতার দৌরাত্ম্যে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে দেশে এক দিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন মূলত হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। জিপি ও পিএস ফার্মের সংখ্যাও সীমিত। এসব প্রতিষ্ঠানে যদি কোনো রোগ সংক্রমণ, উৎপাদন ব্যাঘাত বা ব্যবস্থাপনাগত সংকট দেখা দেয়, তাহলে বিকল্প উৎস না থাকায় পুরো সরবরাহব্যবস্থা হঠাৎ করেই অচল হয়ে পড়তে পারে। তখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

একজন মাঝারি খামারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে বাচ্চা না পেলে পুরো ব্যাচ লোকসানে পড়ে যায়। তখন আমদানির সুযোগ থাকলে অন্তত উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ছোট ও মাঝারি খামারিদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিম উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ১৯১ কোটি, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪৪১ কোটিতে। খাত–সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উৎপাদন ধরে রাখতে হলে ধারাবাহিক বাচ্চা সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ডিম ও মুরগির মাংসের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোল্ট্রি উৎপাদন একটি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। জিপি স্টক আমদানির পর সেগুলো বড় হতে সময় লাগে, এরপর ডিম উৎপাদন, সেখান থেকে পিএস এবং শেষে বাণিজ্যিক বাচ্চা- এই পুরো চক্র সম্পন্ন হতে কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি সময় প্রয়োজন হয়। ফলে হঠাৎ কোনো রোগ প্রাদুর্ভাব বা উৎপাদন ব্যাহত হলে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে এক দিন বয়সী বাচ্চা বা হ্যাচিং ডিম আমদানির বিকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, খসড়া নীতিমালায় এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে কোটি কোটি বাচ্চার বাজার চলে যাবে। তখন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা কোম্পানির নির্ধারিত দামে বাচ্চা কিনতে বাধ্য হবেন, যা কার্যত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলবে। তিনি অভিযোগ করেন, নতুন নীতিমালায় ক্ষুদ্র খামারিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নেই এবং নতুন খামার স্থাপন ও লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও বড় কোম্পানির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ডিম ও মুরগির বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে না, বরং ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়বে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, পোল্ট্রি শিল্প কেবল একটি ব্যবসায়িক খাত নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার একটি বড় ভিত্তি। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ যুক্ত। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া আমদানি নিষিদ্ধ করা হলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই গিয়ে পড়বে।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি বন্ধ করা হলে সংকটকালে পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। আমদানি নিষিদ্ধের আগে বিকল্প ব্যবস্থা, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো রয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান বলেন, দেশে এক দিন বয়সী পোল্ট্রি বাচ্চার একটি স্বাভাবিক দৈনিক চাহিদা রয়েছে। আমদানি বন্ধের আগে নিশ্চিত হতে হবে-দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে এই চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব কি না এবং খামারিরা নিয়মিত ও ন্যায্য দামে বাচ্চা পাচ্ছেন কি না। কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হলে খামারিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া আইন করে আমদানি নিষিদ্ধ করা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা–২০২৬ কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্ন কমিটি, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মতামতের ভিত্তিতে নীতিমালাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা সংশোধনের সুযোগও রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, নীতিমালার মূল লক্ষ্য দেশের পোল্ট্রি খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও স্বনির্ভর করা। সে লক্ষ্যেই আমদানি–রপ্তানি, উৎপাদন ও জৈব নিরাপত্তার বিষয়গুলো নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি নিরুৎসাহিত করা হলেও গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

তার মতে, দেশে বর্তমানে প্যারেন্ট স্টকের একটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে এবং প্রায় ৪০০টির বেশি ব্রিডার ফার্ম এ খাতে যুক্ত। এই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতেই নীতিমালায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নের সময় কোনো অসংগতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে বলেও জানান তিনি। সরকারের উদ্দেশ্য কোনো পক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়, বরং দেশের পোল্ট্রি শিল্পকে আরও সংগঠিত, নিরাপদ ও টেকসই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

 

নতুন কথা/এসআর

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

পবিত্র লাইলাতুল বরাতের রজনী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে

আমদানি নিষিদ্ধের পথে সরকার, পোল্ট্রি শিল্পে সিন্ডিকেট আতঙ্ক

আপডেট সময় ০৬:৪১:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের পোল্ট্রি খাতে আবারও সিন্ডিকেট আতঙ্ক ভর করেছে। সক্ষমতা যাচাই না করেই এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার- এমন খবরে উদ্বিগ্ন খামারি ও খাত- সংশ্লিষ্টরা। ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর চূড়ান্ত খসড়ায় বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালনের জন্য এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খামারিদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের ওপর। একই সঙ্গে বাজারে গুটিকয়েক বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার ঝুঁকিও বাড়বে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক দশকে দেশের পোল্ট্রি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যেখানে মুরগির সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬৮৪ লাখ, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩৬১ লাখে। হাঁসসহ মোট পোল্ট্রির সংখ্যা এখন চার হাজার ৬৬ লাখের বেশি। এই বিশাল উৎপাদন ব্যবস্থার বড় অংশই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্নভাবে এক দিন বয়সী বাচ্চা সরবরাহের ওপর। সামান্য ছন্দপতন হলেই পুরো উৎপাদন চক্রে প্রভাব পড়ে।

সরকারের বক্তব্য, দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর করতে আমদানিনির্ভরতা কমানোই নতুন নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য। তবে খাত–সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবে সেই সক্ষমতা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। তাদের মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই আমদানি বন্ধ করা হলে বাজারে হঠাৎ বাচ্চা সংকট তৈরি হবে, যার চাপ সরাসরি পড়বে ছোট ও মাঝারি খামারিদের ওপর।

নীতিমালার খসড়া অনুযায়ী, এক দিন বয়সী বাণিজ্যিক মুরগির বাচ্চা আমদানির অনুমতি থাকবে না। তবে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। সংকট দেখা দিলে ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ প্যারেন্ট স্টক আমদানির অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ শব্দবন্ধ নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খামারিরা বলছেন, কোন পরিস্থিতিকে প্রয়োজনীয় ধরা হবে, কে সিদ্ধান্ত নেবে এবং কত দ্রুত অনুমোদন মিলবে—এসব বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে সংকটের সময় প্রশাসনিক জটিলতা ও লালফিতার দৌরাত্ম্যে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে দেশে এক দিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন মূলত হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। জিপি ও পিএস ফার্মের সংখ্যাও সীমিত। এসব প্রতিষ্ঠানে যদি কোনো রোগ সংক্রমণ, উৎপাদন ব্যাঘাত বা ব্যবস্থাপনাগত সংকট দেখা দেয়, তাহলে বিকল্প উৎস না থাকায় পুরো সরবরাহব্যবস্থা হঠাৎ করেই অচল হয়ে পড়তে পারে। তখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

একজন মাঝারি খামারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে বাচ্চা না পেলে পুরো ব্যাচ লোকসানে পড়ে যায়। তখন আমদানির সুযোগ থাকলে অন্তত উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ছোট ও মাঝারি খামারিদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিম উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ১৯১ কোটি, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪৪১ কোটিতে। খাত–সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উৎপাদন ধরে রাখতে হলে ধারাবাহিক বাচ্চা সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ডিম ও মুরগির মাংসের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোল্ট্রি উৎপাদন একটি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। জিপি স্টক আমদানির পর সেগুলো বড় হতে সময় লাগে, এরপর ডিম উৎপাদন, সেখান থেকে পিএস এবং শেষে বাণিজ্যিক বাচ্চা- এই পুরো চক্র সম্পন্ন হতে কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি সময় প্রয়োজন হয়। ফলে হঠাৎ কোনো রোগ প্রাদুর্ভাব বা উৎপাদন ব্যাহত হলে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে এক দিন বয়সী বাচ্চা বা হ্যাচিং ডিম আমদানির বিকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, খসড়া নীতিমালায় এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে কোটি কোটি বাচ্চার বাজার চলে যাবে। তখন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা কোম্পানির নির্ধারিত দামে বাচ্চা কিনতে বাধ্য হবেন, যা কার্যত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলবে। তিনি অভিযোগ করেন, নতুন নীতিমালায় ক্ষুদ্র খামারিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নেই এবং নতুন খামার স্থাপন ও লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও বড় কোম্পানির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ডিম ও মুরগির বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে না, বরং ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়বে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, পোল্ট্রি শিল্প কেবল একটি ব্যবসায়িক খাত নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার একটি বড় ভিত্তি। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ যুক্ত। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া আমদানি নিষিদ্ধ করা হলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই গিয়ে পড়বে।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি বন্ধ করা হলে সংকটকালে পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। আমদানি নিষিদ্ধের আগে বিকল্প ব্যবস্থা, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো রয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান বলেন, দেশে এক দিন বয়সী পোল্ট্রি বাচ্চার একটি স্বাভাবিক দৈনিক চাহিদা রয়েছে। আমদানি বন্ধের আগে নিশ্চিত হতে হবে-দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে এই চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব কি না এবং খামারিরা নিয়মিত ও ন্যায্য দামে বাচ্চা পাচ্ছেন কি না। কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হলে খামারিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া আইন করে আমদানি নিষিদ্ধ করা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা–২০২৬ কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্ন কমিটি, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মতামতের ভিত্তিতে নীতিমালাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা সংশোধনের সুযোগও রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, নীতিমালার মূল লক্ষ্য দেশের পোল্ট্রি খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও স্বনির্ভর করা। সে লক্ষ্যেই আমদানি–রপ্তানি, উৎপাদন ও জৈব নিরাপত্তার বিষয়গুলো নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি নিরুৎসাহিত করা হলেও গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

তার মতে, দেশে বর্তমানে প্যারেন্ট স্টকের একটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে এবং প্রায় ৪০০টির বেশি ব্রিডার ফার্ম এ খাতে যুক্ত। এই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতেই নীতিমালায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নের সময় কোনো অসংগতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে বলেও জানান তিনি। সরকারের উদ্দেশ্য কোনো পক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়, বরং দেশের পোল্ট্রি শিল্পকে আরও সংগঠিত, নিরাপদ ও টেকসই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

 

নতুন কথা/এসআর