ঢাকা ১১:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৩ মার্চ থেকে ঈদযাত্রার ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু যুদ্ধের প্রভাব বাজারে, ভরিপ্রতি সোনা ২ লাখ ৭৪ হাজার ছাড়াল কোন কৌশলে এগোতে পারে ইরান: বিশ্লেষকের চোখে সম্ভাব্য পাল্টা পরিকল্পনা অভিনেতা জাহের আলভীর স্ত্রীর মৃত্যুর খবর, পরিবারে শোকের ছায়া মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে: ইরানে হামলা, পাল্টা আঘাতে কাঁপল চার দেশ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী জামায়াতের ইফতার মাহফিলে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী বাঁচা-মরার ম্যাচে পাকিস্তানের একাদশ নিয়ে বিতর্ক, পরামর্শ দিচ্ছেন তারকারা মধ্যরাত থেকে পদ্মা-মেঘনায় দুই মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ পিলখানার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ এখন স্পষ্ট বললেন প্রধানমন্ত্রী

ঢাকায় ধারাবাহিক টার্গেট কিলিং: কাকতালীয় নাকি পরিকল্পিত অপারেশন?

  • আহমেদ শাহেদ:
  • আপডেট সময় ১২:৩৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪৮ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রাজধানী ঢাকায় পরপর সংঘটিত তিনটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নতুন করে ভয় ও অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করেছে। মিরপুর, পল্টন ও কারওয়ানবাজার-ভৌগোলিকভাবে আলাদা হলেও ঘটনার ধরন, সময় নির্বাচন এবং হত্যার কৌশলে এতটাই মিল যে এগুলোকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রতিটি হত্যাকাণ্ড যেন একই ছকের নিখুঁত পুনরাবৃত্তি।

খুব কাছ থেকে গুলি, লক্ষ্য নিশ্চিত করা, তারপর মোটরসাইকেলে চড়ে দ্রুত ও নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়া- এই অভিন্ন কৌশলেই প্রাণ হারিয়েছেন বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলের তিন নেতা। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল কাকতালীয় মিল, নাকি পরিকল্পিত একটি ধারাবাহিক অপারেশনের অংশ?

এই ধারাবাহিকতার সূচনা ঘটে গত বছরের শেষ দিকে মিরপুরে। মিরপুর-১২ এলাকায় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে দোকানের ভেতরে ঢুকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হেলমেট পরা দুই সশস্ত্র ব্যক্তি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হামলা চালিয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেলে উঠে পালিয়ে যায়। জনবহুল এলাকা, দিনের সময়- কিন্তু কাউকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। এত দিন পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যত অগ্রগতিহীন।

এর কয়েক সপ্তাহ পর, ১২ ডিসেম্বর, রাজধানীর পল্টন এলাকায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও রাজনৈতিক নেতা ওসমান হাদী বিকেলে রিকশায় চলাচলের সময় হামলার শিকার হন। একটি মোটরসাইকেল রিকশার পাশে এসে থামে, পেছনে বসা ব্যক্তি খুব কাছ থেকে একাধিক গুলি ছোড়ে। জনসমক্ষে, দিনের আলোতে, ব্যস্ত সড়কে- রাস্তায় রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকেন ওসমান হাদী। হামলার পর দুর্বৃত্তরা আগের ঘটনার মতোই অনায়াসে এলাকা ত্যাগ করে। সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার হলেও মূল পরিকল্পনাকারী বা হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি।

সবশেষ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ৭ জানুয়ারি, কারওয়ানবাজার এলাকায়। বিএনপি স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি চালানো হয়। একাধিক গুলিতে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার ধরন, সময় নির্বাচন ও পালানোর কৌশল—সবই আগের দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। পুলিশ এটিকে ‘পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং’ বললেও সেই পরিকল্পনার নেপথ্যের শক্তি আজও অজানা।

এই তিনটি হত্যাকাণ্ডের মিল কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি ঘটনায় হামলাকারীরা ছিল প্রস্তুত, লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট, পালানোর পথ ছিল আগেই ঠিক করা। কোথাও ধস্তাধস্তি নেই, নেই হঠাৎ উত্তেজনার কোনো চিহ্ন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাধারণ অপরাধী চক্রের কাজ হওয়ার সম্ভাবনা কম; বরং প্রশিক্ষিত পেশাদারদের দ্বারা পরিচালিত একটি সুসংগঠিত অপারেশন বলেই এসব হত্যাকাণ্ড প্রতীয়মান হয়।

নির্বাচনের ঠিক আগে রাজধানীতে এমন ধারাবাহিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলছে। ব্যস্ত এলাকা, জনসমাগম, সিসিটিভি ক্যামেরা- সব থাকার পরও কেন প্রতিবার খুনিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে? কেন একই কায়দায় বারবার হত্যাকাণ্ড ঘটলেও কার্যকর প্রতিরোধ বা দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই?

‘তদন্ত চলছে’- এই একবাক্য বক্তব্য ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো আশ্বস্ত করার মতো কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এক মাসে তিনটি রাজনৈতিক হত্যা, একই অস্ত্রের ভাষা, একই পালানোর পথ—এত মিল কেবল কাকতালীয় হলে তা বিশ্বাস করা কঠিন।

সাধারণ মানুষের চোখে বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে- এগুলো নিছক অপরাধ নয়, বরং আসন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভয়, নীরবতা ও অনিশ্চয়তার একটি সুস্পষ্ট বার্তা। প্রশ্ন শুধু একটাই- এই বার্তার জবাব রাষ্ট্র কবে, কীভাবে দেবে?

নতুন কথা/এসআর

৩ মার্চ থেকে ঈদযাত্রার ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু

ঢাকায় ধারাবাহিক টার্গেট কিলিং: কাকতালীয় নাকি পরিকল্পিত অপারেশন?

আপডেট সময় ১২:৩৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রাজধানী ঢাকায় পরপর সংঘটিত তিনটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নতুন করে ভয় ও অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করেছে। মিরপুর, পল্টন ও কারওয়ানবাজার-ভৌগোলিকভাবে আলাদা হলেও ঘটনার ধরন, সময় নির্বাচন এবং হত্যার কৌশলে এতটাই মিল যে এগুলোকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রতিটি হত্যাকাণ্ড যেন একই ছকের নিখুঁত পুনরাবৃত্তি।

খুব কাছ থেকে গুলি, লক্ষ্য নিশ্চিত করা, তারপর মোটরসাইকেলে চড়ে দ্রুত ও নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়া- এই অভিন্ন কৌশলেই প্রাণ হারিয়েছেন বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলের তিন নেতা। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল কাকতালীয় মিল, নাকি পরিকল্পিত একটি ধারাবাহিক অপারেশনের অংশ?

এই ধারাবাহিকতার সূচনা ঘটে গত বছরের শেষ দিকে মিরপুরে। মিরপুর-১২ এলাকায় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে দোকানের ভেতরে ঢুকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হেলমেট পরা দুই সশস্ত্র ব্যক্তি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হামলা চালিয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেলে উঠে পালিয়ে যায়। জনবহুল এলাকা, দিনের সময়- কিন্তু কাউকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। এত দিন পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যত অগ্রগতিহীন।

এর কয়েক সপ্তাহ পর, ১২ ডিসেম্বর, রাজধানীর পল্টন এলাকায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও রাজনৈতিক নেতা ওসমান হাদী বিকেলে রিকশায় চলাচলের সময় হামলার শিকার হন। একটি মোটরসাইকেল রিকশার পাশে এসে থামে, পেছনে বসা ব্যক্তি খুব কাছ থেকে একাধিক গুলি ছোড়ে। জনসমক্ষে, দিনের আলোতে, ব্যস্ত সড়কে- রাস্তায় রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকেন ওসমান হাদী। হামলার পর দুর্বৃত্তরা আগের ঘটনার মতোই অনায়াসে এলাকা ত্যাগ করে। সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার হলেও মূল পরিকল্পনাকারী বা হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি।

সবশেষ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ৭ জানুয়ারি, কারওয়ানবাজার এলাকায়। বিএনপি স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি চালানো হয়। একাধিক গুলিতে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার ধরন, সময় নির্বাচন ও পালানোর কৌশল—সবই আগের দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। পুলিশ এটিকে ‘পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং’ বললেও সেই পরিকল্পনার নেপথ্যের শক্তি আজও অজানা।

এই তিনটি হত্যাকাণ্ডের মিল কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি ঘটনায় হামলাকারীরা ছিল প্রস্তুত, লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট, পালানোর পথ ছিল আগেই ঠিক করা। কোথাও ধস্তাধস্তি নেই, নেই হঠাৎ উত্তেজনার কোনো চিহ্ন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাধারণ অপরাধী চক্রের কাজ হওয়ার সম্ভাবনা কম; বরং প্রশিক্ষিত পেশাদারদের দ্বারা পরিচালিত একটি সুসংগঠিত অপারেশন বলেই এসব হত্যাকাণ্ড প্রতীয়মান হয়।

নির্বাচনের ঠিক আগে রাজধানীতে এমন ধারাবাহিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলছে। ব্যস্ত এলাকা, জনসমাগম, সিসিটিভি ক্যামেরা- সব থাকার পরও কেন প্রতিবার খুনিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে? কেন একই কায়দায় বারবার হত্যাকাণ্ড ঘটলেও কার্যকর প্রতিরোধ বা দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই?

‘তদন্ত চলছে’- এই একবাক্য বক্তব্য ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো আশ্বস্ত করার মতো কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এক মাসে তিনটি রাজনৈতিক হত্যা, একই অস্ত্রের ভাষা, একই পালানোর পথ—এত মিল কেবল কাকতালীয় হলে তা বিশ্বাস করা কঠিন।

সাধারণ মানুষের চোখে বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে- এগুলো নিছক অপরাধ নয়, বরং আসন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভয়, নীরবতা ও অনিশ্চয়তার একটি সুস্পষ্ট বার্তা। প্রশ্ন শুধু একটাই- এই বার্তার জবাব রাষ্ট্র কবে, কীভাবে দেবে?

নতুন কথা/এসআর