লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা। বুধবার বিকেল ৩টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। কনকনে শীত উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ঢল নামে জানাজাস্থলে। কালো পোশাক, নীরবতা আর চোখের জলে জাতি বিদায় জানায় ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মো. আব্দুল মালেক জানাজায় ইমামতি করেন। তার কণ্ঠে দোয়ার ধ্বনি ছড়িয়ে পড়লে গোটা প্রাঙ্গণজুড়ে নেমে আসে শোকের নিস্তব্ধতা। লাখো মানুষের সেই নীরব উপস্থিতি যেন খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি এক অনুচ্চারিত শ্রদ্ধা।
এর আগে বুধবার দুপুর ১২টার একটু পর জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খালেদা জিয়ার কফিনবাহী গাড়ি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রবেশ করে। সকাল ১১টার দিকে গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসা থেকে মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স যাত্রা শুরু করে। তারও আগে সকাল ৯টা ১৭ মিনিটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স তারেক রহমানের বাসায় পৌঁছায়।
জানাজা শেষে খালেদা জিয়াকে দাফন করা হয় তার স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রটোকল অনুসরণ করে সম্পন্ন হয় দাফন কার্যক্রম। এই শেষ বিদায়ে অংশ নিতে ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশের প্রতিনিধিরাও ঢাকায় উপস্থিত হন।
খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তার পাশে ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধানসহ রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। জানাজা ও দাফন ঘিরে এভারকেয়ার হাসপাতাল, জাতীয় সংসদ ভবন ও জিয়া উদ্যান এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকায় মোতায়েন ছিলেন।
এর আগে বুধবার সকালে গুলশান অ্যাভিনিউয়ের বাসভবনে নেওয়া হলে সেখানে খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানান বিএনপির নেতাকর্মী ও স্বজনেরা। মায়ের কফিনের পাশে বসে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করতে দেখা যায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। নীরব সেই দৃশ্য বহু মানুষের চোখ ভিজিয়ে দেয়।
খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে গভীর শোক জানাতে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি ভারতের পক্ষ থেকে পাঠানো শোকবার্তা তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। একইভাবে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকও তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ছিলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর এক গৃহবধূ থেকে ধীরে ধীরে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তিনি। নানা ষড়যন্ত্র, প্রতিকূলতা আর রাজনৈতিক ঝড় মোকাবিলা করে তিনি হন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে খালেদা জিয়াই একমাত্র নেতা, যিনি পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই জয়ী হয়েছেন। ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর কিংবা খুলনা—যেখানেই নির্বাচন করেছেন, সেখানেই জনগণের রায়ে বিজয়ী হয়েছেন তিনি।
ভোটে হারের কোনো গল্প নেই তার রাজনৈতিক জীবনে। এমনকি যেসব নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারেনি, সেসব নির্বাচনেও তিনি সব আসনে জয়ী হয়েছেন। জনপ্রিয়তার এই রেকর্ড বাংলাদেশ তো বটেই, উপমহাদেশের রাজনীতিতেও বিরল।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন টানা ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং দুইবার বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন। কখনো আপস না করা, দৃঢ় অবস্থান আর গণতন্ত্রের প্রশ্নে অনড় থাকার কারণেই তিনি পেয়েছিলেন এই বিশেষ পরিচিতি।
জীবনের শেষ সময়টা কেটেছে হাসপাতালের বিছানায়। দীর্ঘদিন ধরেই লিভার সিরোসিস, কিডনি, ডায়াবেটিস, ফুসফুস ও আর্থ্রাইটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। গত ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে জরুরি ভিত্তিতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাসের বেশি সময় তিনি সিসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাহী আদেশে কারামুক্তি পান তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাকে লন্ডনে নেওয়া হয়। সেখান থেকে দেশে ফেরার পরও একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালই যেন হয়ে ওঠে তার জীবনের শেষ ঠিকানা।
মঙ্গলবার ভোর ৬টার দিকে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ইন্তেকাল করেন বেগম খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুতে সরকার বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। আজ বুধবার সারাদেশে সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে।
এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তির মধ্য দিয়ে শোকস্তব্ধ বাংলাদেশ আজ বিদায় জানাল এক সময়ের প্রভাবশালী, দৃঢ়চেতা ও আপসহীন নেত্রীকে- যার নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে ভিন্ন উচ্চতায়।
নতুন কথা/এএস
নিজস্ব প্রতিবেদক: 




















