ঢাকা ১১:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকায় নিজ বাসা থেকে জামায়াত নেতার মরদেহ উদ্ধার ত্বকের বলিরেখা কমাতে যেসব প্রাকৃতিক তেল হতে পারে ভরসা ভারতের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ আইসিসির, অবস্থানে অটল বিসিবি ইরানে নজিরবিহীন বিক্ষোভে নিহত প্রায় ২ হাজার মানুষ: সরকারি কর্মকর্তা বিএনপি নেতা ডাবলুর মৃত্যু: অভিযানে অংশ নেওয়া সব সেনাসদস্য প্রত্যাহার, তদন্ত কমিটি গঠন জ্বালানি সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ, তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সরকার: সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা : সালাহউদ্দিন আহমদ সবোজলাইয়ের নায়ক-খলনায়ক রাতেও বার্নসলিকে উড়িয়ে চতুর্থ রাউন্ডে লিভারপুল জীবনদর্শনের দূরত্বেই ফাটল: যে কারণে টেকেনি তাহসান-রোজার সংসার শিক্ষা শুধু চাকরির কারখানা নয়, সৃজনশীল মানুষ গড়ার পথ: প্রধান উপদেষ্টা

কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন: তিন নির্বাচনের নীলনকশা: ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার

আওয়ামী লীগকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় রাখতে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল পরিকল্পিত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত- এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে ব্যবহার করে এই তিন নির্বাচন আয়োজন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ‘জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন’ তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে। প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভোট ডাকাতি যেন আর কখনও না ঘটে, সে জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার’ একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এর অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে নির্বাচন পরিচালনার প্রকৃত ক্ষমতা সরিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ফলে নির্বাচন কমিশন প্রান্তিক হয়ে পড়ে এবং প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক শক্তি।

কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বাকি আসনগুলোর নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও পূর্বপরিকল্পিত। এই নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর নতুন কৌশল নেওয়া হয়। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল সেই পরিকল্পনার গভীরতা অনুধাবন করতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়। তদন্তে দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ফল নির্ধারণ করা হয়। কোথাও কোথাও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অসৎ প্রতিযোগিতার কারণে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশের বেশি দেখানো হয়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ বড় বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় তথাকথিত ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনকে কৃত্রিমভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর অপচেষ্টা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু নির্দিষ্ট কর্মকর্তার সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’, যা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বিপুল হওয়ায় এবং তদন্তের জন্য নির্ধারিত সময় সীমিত থাকায় কারা কোন ভূমিকায় ছিলেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনে ২০০৮ সালের নির্বাচনকেও সন্দেহজনক উল্লেখ করে সেটি নিয়েও তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সভাপতি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি নির্বাচনের মাস্টারপ্ল্যান একটাই এবং এর সূচনা হয় ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর। তিনি বলেন, ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকার পথে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একটি বড় বাধা ছিল। ২০১১ সালে সেই ব্যবস্থা বাতিলের পর যেসব নির্বাচন হয়েছে, তার প্রকৃত চিত্র এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দেশের মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। জনগণ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল, কিছু করার সুযোগ পায়নি। তিনি বলেন, যারা এই নির্বাচন ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের চিহ্নিত করে জাতির সামনে আনতে হবে, যেন ভবিষ্যতে আর কখনও এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।

 

নতুন কথা/এসআর

ট্যাগস :

ঢাকায় নিজ বাসা থেকে জামায়াত নেতার মরদেহ উদ্ধার

কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন: তিন নির্বাচনের নীলনকশা: ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার

আপডেট সময় ১১:৪০:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

আওয়ামী লীগকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় রাখতে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল পরিকল্পিত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত- এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে ব্যবহার করে এই তিন নির্বাচন আয়োজন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ‘জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন’ তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে। প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভোট ডাকাতি যেন আর কখনও না ঘটে, সে জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার’ একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এর অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে নির্বাচন পরিচালনার প্রকৃত ক্ষমতা সরিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ফলে নির্বাচন কমিশন প্রান্তিক হয়ে পড়ে এবং প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক শক্তি।

কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বাকি আসনগুলোর নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও পূর্বপরিকল্পিত। এই নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর নতুন কৌশল নেওয়া হয়। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল সেই পরিকল্পনার গভীরতা অনুধাবন করতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়। তদন্তে দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ফল নির্ধারণ করা হয়। কোথাও কোথাও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অসৎ প্রতিযোগিতার কারণে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশের বেশি দেখানো হয়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ বড় বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় তথাকথিত ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনকে কৃত্রিমভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর অপচেষ্টা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু নির্দিষ্ট কর্মকর্তার সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’, যা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বিপুল হওয়ায় এবং তদন্তের জন্য নির্ধারিত সময় সীমিত থাকায় কারা কোন ভূমিকায় ছিলেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনে ২০০৮ সালের নির্বাচনকেও সন্দেহজনক উল্লেখ করে সেটি নিয়েও তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সভাপতি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি নির্বাচনের মাস্টারপ্ল্যান একটাই এবং এর সূচনা হয় ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর। তিনি বলেন, ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকার পথে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একটি বড় বাধা ছিল। ২০১১ সালে সেই ব্যবস্থা বাতিলের পর যেসব নির্বাচন হয়েছে, তার প্রকৃত চিত্র এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দেশের মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। জনগণ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল, কিছু করার সুযোগ পায়নি। তিনি বলেন, যারা এই নির্বাচন ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের চিহ্নিত করে জাতির সামনে আনতে হবে, যেন ভবিষ্যতে আর কখনও এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।

 

নতুন কথা/এসআর