বিজয়ের পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি স্বচ্ছ ও বিতর্কমুক্ত চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই দীর্ঘদিনের জট খুলবে- এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, বিশাল যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া, জনবল সংকট, সময় ও অর্থের সীমাবদ্ধতায় কাজটি সহজ হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশজুড়ে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই একটি বড় কর্মযজ্ঞ। তবে চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) জানিয়েছে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাতিলের কাজ ইতোমধ্যে জোরদার করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২২’ সংশোধন করে গত ৩ জুন ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। নতুন অধ্যাদেশে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’র সংজ্ঞায় মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে যারা সরাসরি রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছেন, তারাই কেবল ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। অন্যদিকে, সংগঠক, কূটনৈতিক সহায়তাকারী বা স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিরা ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
কিন্তু অধ্যাদেশ জারির ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীদের আলাদা তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বীর মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, আইন অনুযায়ী দ্রুত এই শ্রেণিবিন্যাস সম্পন্ন করা জরুরি; একই সঙ্গে একটি নির্ভুল ও স্থায়ী তালিকা তৈরি করতে হবে।
জামুকার সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আহমেদ খান বলেন, যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যাচ্ছে, অভিযোগের বড় একটি অংশই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত। তাঁর ভাষায়, “৮০ শতাংশের মতো অভিযোগে আমরা ভুয়া তথ্য পাচ্ছি। সেগুলো যাচাই করে গেজেট বাতিলের সুপারিশ করা হচ্ছে।” তিনি জানান, সপ্তাহে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার। তবে জামুকার সদস্যদের দাবি, ঐতিহাসিক দলিল ও মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য অনুযায়ী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা সর্বোচ্চ এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি হওয়ার কথা নয়। সে হিসাবে বর্তমান তালিকার বড় একটি অংশ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালক শাহিনা খাতুন জানান, চারটি আলাদা টিম যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই, অভিযোগ নিষ্পত্তি, রিট মামলার রায় বাস্তবায়ন এবং তথ্য সংশোধনের কাজ করছে। তবে সারাদেশে একযোগে যাচাই-বাছাই করতে প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থের সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে তালিকা চূড়ান্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। জামুকার মেয়াদ পরবর্তী সরকারেও বহাল থাকবে- এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আন্তরিকতা থাকলে এই কাজ অনেকটাই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বীর প্রতীক মিজানুর রহমান খান বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীদের পৃথক তালিকা করার দাবিটি বহুদিনের। আইন হয়েছে, এখন প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন। তাঁর মতে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষা এবং ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার স্বার্থেই এই কাজ বিলম্বিত হওয়া উচিত নয়।
সব মিলিয়ে, বিজয়ের ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন এখনো বাংলাদেশের জন্য এক অসমাপ্ত অধ্যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময় ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে এই তালিকা শতভাগ না হলেও প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে চূড়ান্ত করা সম্ভব।
নতুনকথা/এএস
নিজস্ব সংবাদ : 




















