সংস্কারের নামে অন্তর্বর্তী সরকার যে আটটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির অভিযোগ, এসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার তো দূরের কথা, বরং সরকার কার্যত আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সংস্কারের নামে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। কেন এই আত্মসমর্পণ ঘটেছে এবং সরকারের দুর্বলতা কোথায়—এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকার কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, সে বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকায় এর নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ নিয়ে টিআইবির বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
টিআইবির সার্বিক বিশ্লেষণে বলা হয়, সংস্কারের জন্য কোন খাত বা প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট কৌশল সরকারের মধ্যে দেখা যায়নি। ১১টি কমিশন ও কমিটির বাইরে শিক্ষা, কৃষি কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার মতো জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো কেন সংস্কারের বাইরে রাখা হলো, তারও কোনো ব্যাখ্যা নেই। গণভোটের সিদ্ধান্ত ছাড়া সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর কর্মপরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হয়নি। শুরু থেকেই সংস্কারবিরোধী শক্তিকে চিহ্নিত করে প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা সরকার অনুধাবন করেনি। বরং সেই অপশক্তির কাছে নতি স্বীকার করায় বহু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল হয়েছে এবং সংস্কারবিরোধী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এমনকি জুলাই সনদ লঙ্ঘন করে নেতিবাচক নজির স্থাপনের অভিযোগও তুলেছে সংস্থাটি।
পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, অধিকাংশ সংস্কার কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, নারী, শ্রম ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর প্রণীত শ্বেতপত্রের সুপারিশ বাস্তবায়নেও কোনো কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি।
টিআইবির অভিযোগ, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ অধ্যাদেশই অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করেই একতরফাভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খসড়া অধ্যাদেশ স্বল্প সময়ের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দায়সারা দায়িত্ব পালন করা হয়েছে। এমনকি কিছু অংশীজনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ঘটনাও ঘটেছে। আইন প্রণয়ন ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের চর্চা সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বলেও মন্তব্য করা হয়।
আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের নতি স্বীকারের উদাহরণ তুলে ধরে টিআইবি জানায়, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও এনজিও খাতে বিদেশি অনুদান সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংস্কারবিরোধী, বিশেষ করে প্রভাবশালী আমলাতান্ত্রিক মহলের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতায় সংস্কার লক্ষ্যচ্যুত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সাইবার সুরক্ষা ও উপাত্ত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অধ্যাদেশে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে আমলাতন্ত্র ও ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র ও জবাবদিহিহীন কর্তৃত্ব বজায় রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে টিআইবি বলেছে, অধ্যাদেশটি যেভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে, তাতে স্বাধীন পুলিশ কমিশনের ধারণাই ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। এটি বাস্তবে অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ও পুলিশ আমলাদের ক্ষমতার অপব্যবহার টিকিয়ে রাখার একটি নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হতে পারে।
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ নিয়েও হতাশা প্রকাশ করে টিআইবি জানায়, আন্তর্জাতিক মানের একটি আইন প্রণয়নের সুযোগ থাকলেও খসড়া প্রণয়নে যুক্ত অংশীজনদের অন্ধকারে রেখে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও কর্তৃত্ববাদী আমলের মতো ব্যাপক নজরদারিভিত্তিক শাসনব্যবস্থা বহাল রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও মন্তব্য করে সংস্থাটি।
দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষিত থাকার অভিযোগ তুলে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদককে কার্যকর করার বিষয়ে সরকারের কোনো সুস্পষ্ট কৌশলগত অঙ্গীকার নেই। অথচ দুদক কার্যকর হলে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি হতো।
গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদ থাকলেও বাস্তবে অপারেশনাল সিদ্ধান্ত সেখান থেকে আসে না। কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে, কোন ধারা থাকবে বা বাদ যাবে—এসব নির্ধারণ করে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের কিছু ক্ষমতাবান মহল, যারা নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামানসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন কথা/এসআর
নিজস্ব প্রতিবেদক: 




















