যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকের ভেতর তখন নীরবতা। প্রহরার মাঝেই পাশাপাশি রাখা দুটি নিথর দেহ—একটি ২২ বছরের কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর, অন্যটি তার মাত্র ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসান নাজিফের। শনিবার সন্ধ্যায় বাগেরহাট থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে লাশ দুটি আনা হয় যশোর কারাগারে। সেখানে বন্দি আছেন শিশুটির বাবা, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম।
কারারক্ষীদের প্রহরায়, মাত্র চার-পাঁচ মিনিটের জন্য শেষবারের মতো স্ত্রী ও সন্তানকে দেখার সুযোগ পান সাদ্দাম। চোখে জল, কণ্ঠে ভার। সেই হৃদয়বিদারক মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তাঁর ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমি ভাইকে বলছিলাম, অন্তত ছেলেটাকে কোলে নে। ভাই বলছিল- জীবিত অবস্থায় কোলে নিতে পারিনি, মরার পর নিয়ে কী হবে?”
শিশুটির নিথর দেহে হাত রেখে সাদ্দাম বলছিলেন, “ভালো বাপ হতে পারিনি। তোর বাপকে ক্ষমা করে দিস।” স্ত্রীর দিকেও একই অনুতাপ- “ভালো স্বামী হতে পারলাম না। ক্ষমা করে দিও।”
শহিদুল বলেন, কারাফটকে দাঁড়িয়েই সাদ্দাম পলিথিনে মোড়ানো দুই মুঠো মাটি তুলে দেন। বলেন, “এক মুঠি তোর ভাবির কবরে, আরেক মুঠি ছেলের কবরে দিস।” কীভাবে সেই মাটি তিনি পেলেন, তা কেউ জানে না। তবে দৃশ্যটি দেখে উপস্থিত সবার চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে স্বর্ণালী ও তাঁর শিশুসন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘরের সিলিংয়ে রশির সঙ্গে ঝুলছিল স্বর্ণালীর মরদেহ। আর শিশুটিকে পাওয়া যায় বাথরুমের বালতির পানিতে ডোবানো অবস্থায়।
স্বজনরা দ্রুত শিশুটিকে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়।
সাদ্দাম তখন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। তিনি ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা সভাপতি ছিলেন। পরিবারের দাবি, একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার ও জেল বদলির কারণে স্বর্ণালী গভীর হতাশায় ভুগছিলেন।
স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি- এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে প্রশাসনের ভাষ্য ভিন্ন।
যশোর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাদ্দামের পরিবার প্যারোলে মুক্তির জন্য কোনো লিখিত আবেদন করেনি। বরং মানবিক বিবেচনায় কারা কর্তৃপক্ষ কারাফটকে মরদেহ দেখার ব্যবস্থা করে।
যশোরের জেলা প্রশাসক আশেক হাসান বলেন, “প্যারোল বিষয়ে কোনো লিখিত বা মৌখিক আবেদন আমাদের কাছে আসেনি।”
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, যেহেতু বন্দি যশোর কারাগারে ছিলেন, প্যারোল দেওয়ার এখতিয়ার বাগেরহাটের ছিল না।
কারা কর্তৃপক্ষও জানায়, নিয়ম অনুযায়ী বন্দি যে জেলায় আছেন, সেই জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন ছাড়া প্যারোল সম্ভব নয়। তবে মানবিক কারণে মরদেহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের এপ্রিলে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন সাদ্দাম। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি এজাহারভুক্ত, বাকিগুলোতে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে পরিবারের দাবি। তিনবার জামিন পেলেও প্রতিবারই অন্য মামলায় কারাফটক থেকেই পুনরায় গ্রেপ্তার হন তিনি।
নিহত স্বর্ণালীর বাবা মো. রুহুল আমিন বাগেরহাট সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, “মেয়ে আত্মহত্যা করলেও নাতিটা কীভাবে মারা গেল?”
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তে স্বর্ণালীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। শিশুটির ফুসফুস ও মস্তিষ্কে পানি পাওয়া গেছে, যা পানিতে ডুবে মৃত্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এটি দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড- তা তদন্ত শেষে জানা যাবে।
শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে সাবেকডাঙ্গা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে মা ও শিশুকে পাশাপাশি দাফন করা হয়। তার আগে ঈদগাহ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
কারাফটকের সেই শেষ চার–পাঁচ মিনিট- অশ্রু, অনুতাপ আর একমুঠো মাটির স্মৃতি হয়ে থেকে গেল সাদ্দামের জীবনে। বন্দি দেয়ালের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক বাবার জন্য, হয়তো সেটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়।
নতুন কথা/এসআর
নিজস্ব প্রতিবেদক 















