মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কঠোর অবস্থান এবং পারস্য উপসাগরে জাহাজে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় জ্বালানি বাজারে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ।
বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বার্তায় মোজতবা খামেনি জানান, হরমুজ প্রণালীকে ইরান ‘চাপ প্রয়োগের কৌশল’ হিসেবে ব্যবহার করবে এবং প্রয়োজন হলে এটি বন্ধই রাখা হবে। একই সঙ্গে তিনি ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর আরও হামলার হুমকিও দেন। উল্লেখ্য, চলমান সংঘাতের শুরুতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
তার এই ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বৈশ্বিক তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই (WTI) তেলের দামও বেড়ে ৯৫ ডলার ছাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকস সতর্ক করে জানিয়েছে, তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকে, তবে তা বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বড় অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে।
ইতিহাসের বড় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) তাদের সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক তেলের বাজারে ইতিহাসের অন্যতম বড় সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রতিদিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৩২টি দেশ তাদের জরুরি মজুত থেকে রেকর্ড ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তেলের দাম কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজার থেকে কার্যত হারিয়ে যাচ্ছে। এই হিসাবে জরুরি মজুত থেকে ছাড়া তেল সর্বোচ্চ ২৬ দিনই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।
ট্যাঙ্কারে হামলা ও উৎপাদন কমানোর চাপ
পারস্য উপসাগর অঞ্চলেও উত্তেজনা বাড়ছে। বৃহস্পতিবার ইরাকি জলসীমায় দুটি বিদেশি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত দুই দিনে এই অঞ্চলে অন্তত ছয়টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সূত্র জানিয়েছে।
এই অস্থিরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ- সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইন তাদের তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। কারণ, নিরাপদ রপ্তানি রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেক স্টোরেজ ট্যাংক ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে।
আইইএ-র তথ্য অনুযায়ী, ১০ মার্চের মধ্যে দৈনিক তেল উৎপাদন কমে অন্তত ১০ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে।
বিশ্ব শেয়ারবাজারেও প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও। এশিয়া, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন পরিস্থিতির পরবর্তী ধাপ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন এবং সংঘাতের গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
নতুন কথা/এসআর
নিজস্ব সংবাদ : 
























