ঢাকা ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ৩০ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকায় নিজ বাসা থেকে জামায়াত নেতার মরদেহ উদ্ধার ত্বকের বলিরেখা কমাতে যেসব প্রাকৃতিক তেল হতে পারে ভরসা ভারতের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ আইসিসির, অবস্থানে অটল বিসিবি ইরানে নজিরবিহীন বিক্ষোভে নিহত প্রায় ২ হাজার মানুষ: সরকারি কর্মকর্তা বিএনপি নেতা ডাবলুর মৃত্যু: অভিযানে অংশ নেওয়া সব সেনাসদস্য প্রত্যাহার, তদন্ত কমিটি গঠন জ্বালানি সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ, তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সরকার: সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা : সালাহউদ্দিন আহমদ সবোজলাইয়ের নায়ক-খলনায়ক রাতেও বার্নসলিকে উড়িয়ে চতুর্থ রাউন্ডে লিভারপুল জীবনদর্শনের দূরত্বেই ফাটল: যে কারণে টেকেনি তাহসান-রোজার সংসার শিক্ষা শুধু চাকরির কারখানা নয়, সৃজনশীল মানুষ গড়ার পথ: প্রধান উপদেষ্টা

অনলাইনে কাঁচা খেজুর রসের রমরমা বাণিজ্য, নিপাহ ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

বাংলাদেশের শীত মানেই খেজুর রস। ভোরের কুয়াশায় মাটির হাঁড়িতে জমে ওঠা কাঁচা রস কেবল একটি পানীয় নয়- এটি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য, আবেগ আর শীতকালীন সংস্কৃতির অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে সেই সহজলভ্য গ্রামীণ স্বাদ আজ শহুরে জীবনে রূপ নিয়েছে এক ধরনের বিলাসী আকাঙ্ক্ষায়। আর এই আকাঙ্ক্ষাকেই পুঁজি করে অনলাইনে গড়ে উঠেছে কাঁচা খেজুর রসের এক বিপজ্জনক বাজার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে শত শত পেজ ও অ্যাকাউন্ট ‘খাঁটি’, ‘নিরাপদ’, ‘নিষ্কলুষ’ দাবি করে কাঁচা খেজুর রস বিক্রি করছে। রাজধানী ঢাকাসহ যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, রাজশাহী ও গাজীপুরের মতো জেলাগুলোতে এই রস অনলাইনে অর্ডার নিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে।
খাঁটি বিডি, জারিফ ফুডস, বিখ্যাত ৬৪, খেজুরতলা, সাধ্যের মধ্যে, ফ্রেশ ফুড হাট ডটকম- এমন নানা ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে রসটি ‘ফ্রেশ এনার্জি ড্রিংক’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপনগুলোতে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, বাদুড় ও পাখির সংস্পর্শ এড়াতে গাছে জাল দেওয়া হয়, রস সংগ্রহ করা হয় ‘স্বাস্থ্যসম্মত’ উপায়ে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচা খেজুর রস নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের একটি প্রমাণিত উৎস। নিপাহ একটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী ভাইরাস, যার কোনো কার্যকর চিকিৎসা এখনো নেই। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুহার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশেরও বেশি।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৩ জন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন অন্তত ৭১ শতাংশ। শুধু ২০২৪ সালেই আক্রান্ত পাঁচজনের সবাই প্রাণ হারিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলছেন, অনলাইনে বা অফলাইনে কাঁচা রস সংগ্রহ করে ফ্রিজে রেখে সরবরাহ করলেও তা নিরাপদ হয়ে যায় না। কারণ, ফ্রিজিং তাপমাত্রায় নিপাহ ভাইরাস নিষ্ক্রিয় হয় না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- কোন রসে ভাইরাস আছে আর কোনটিতে নেই, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে নির্ণয় করার কোনো উপায় নেই।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, কাঁচা খেজুর রস পান করা অনেকটা নোংরা হাতে ভাত খাওয়ার মতো। সবাই অসুস্থ নাও হতে পারে, কিন্তু যাঁরা আক্রান্ত হন, তাঁদের মৃত্যুর ঝুঁকি খুব বেশি।

তার মতে, কাঁচা খেজুর রস ফুটিয়ে পান করা, কিংবা পিঠা বা গুড় তৈরিতে ব্যবহার করাই একমাত্র নিরাপদ পদ্ধতি।

সরকারি দপ্তর, গবেষণা সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর সতর্কবার্তা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। অনলাইন ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে কাঁচা খেজুর রসের বিপণন চালিয়ে যাচ্ছেন, আর ভোক্তারাও ঝুঁকি সম্পর্কে না জেনেই তা কিনছেন।

এই পরিস্থিতিতে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং অনলাইনে কাঁচা খেজুর রস বিক্রি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

খেজুর রস আমাদের সংস্কৃতির অংশ- এতে কোনো দ্বিমত নেই। তবে সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই নিরাপদ ভোগের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কাঁচা রস নয়, বরং ফুটানো রস, গুড় ও পিঠার মধ্য দিয়েই খেজুর রসের স্বাদ ও ঐতিহ্য নিরাপদভাবে উপভোগ করা সম্ভব।

ঐতিহ্যের নামে জীবনঝুঁকি নেওয়া নয়- এই বোধটাই এখন সময়ের দাবি।

 

নতুন কথা/ এসআর

ট্যাগস :

ঢাকায় নিজ বাসা থেকে জামায়াত নেতার মরদেহ উদ্ধার

অনলাইনে কাঁচা খেজুর রসের রমরমা বাণিজ্য, নিপাহ ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

আপডেট সময় ১২:৫৪:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের শীত মানেই খেজুর রস। ভোরের কুয়াশায় মাটির হাঁড়িতে জমে ওঠা কাঁচা রস কেবল একটি পানীয় নয়- এটি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য, আবেগ আর শীতকালীন সংস্কৃতির অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে সেই সহজলভ্য গ্রামীণ স্বাদ আজ শহুরে জীবনে রূপ নিয়েছে এক ধরনের বিলাসী আকাঙ্ক্ষায়। আর এই আকাঙ্ক্ষাকেই পুঁজি করে অনলাইনে গড়ে উঠেছে কাঁচা খেজুর রসের এক বিপজ্জনক বাজার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে শত শত পেজ ও অ্যাকাউন্ট ‘খাঁটি’, ‘নিরাপদ’, ‘নিষ্কলুষ’ দাবি করে কাঁচা খেজুর রস বিক্রি করছে। রাজধানী ঢাকাসহ যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, রাজশাহী ও গাজীপুরের মতো জেলাগুলোতে এই রস অনলাইনে অর্ডার নিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে।
খাঁটি বিডি, জারিফ ফুডস, বিখ্যাত ৬৪, খেজুরতলা, সাধ্যের মধ্যে, ফ্রেশ ফুড হাট ডটকম- এমন নানা ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে রসটি ‘ফ্রেশ এনার্জি ড্রিংক’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপনগুলোতে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, বাদুড় ও পাখির সংস্পর্শ এড়াতে গাছে জাল দেওয়া হয়, রস সংগ্রহ করা হয় ‘স্বাস্থ্যসম্মত’ উপায়ে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচা খেজুর রস নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের একটি প্রমাণিত উৎস। নিপাহ একটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী ভাইরাস, যার কোনো কার্যকর চিকিৎসা এখনো নেই। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুহার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশেরও বেশি।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৩ জন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন অন্তত ৭১ শতাংশ। শুধু ২০২৪ সালেই আক্রান্ত পাঁচজনের সবাই প্রাণ হারিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলছেন, অনলাইনে বা অফলাইনে কাঁচা রস সংগ্রহ করে ফ্রিজে রেখে সরবরাহ করলেও তা নিরাপদ হয়ে যায় না। কারণ, ফ্রিজিং তাপমাত্রায় নিপাহ ভাইরাস নিষ্ক্রিয় হয় না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- কোন রসে ভাইরাস আছে আর কোনটিতে নেই, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে নির্ণয় করার কোনো উপায় নেই।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, কাঁচা খেজুর রস পান করা অনেকটা নোংরা হাতে ভাত খাওয়ার মতো। সবাই অসুস্থ নাও হতে পারে, কিন্তু যাঁরা আক্রান্ত হন, তাঁদের মৃত্যুর ঝুঁকি খুব বেশি।

তার মতে, কাঁচা খেজুর রস ফুটিয়ে পান করা, কিংবা পিঠা বা গুড় তৈরিতে ব্যবহার করাই একমাত্র নিরাপদ পদ্ধতি।

সরকারি দপ্তর, গবেষণা সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর সতর্কবার্তা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। অনলাইন ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে কাঁচা খেজুর রসের বিপণন চালিয়ে যাচ্ছেন, আর ভোক্তারাও ঝুঁকি সম্পর্কে না জেনেই তা কিনছেন।

এই পরিস্থিতিতে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং অনলাইনে কাঁচা খেজুর রস বিক্রি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

খেজুর রস আমাদের সংস্কৃতির অংশ- এতে কোনো দ্বিমত নেই। তবে সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই নিরাপদ ভোগের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কাঁচা রস নয়, বরং ফুটানো রস, গুড় ও পিঠার মধ্য দিয়েই খেজুর রসের স্বাদ ও ঐতিহ্য নিরাপদভাবে উপভোগ করা সম্ভব।

ঐতিহ্যের নামে জীবনঝুঁকি নেওয়া নয়- এই বোধটাই এখন সময়ের দাবি।

 

নতুন কথা/ এসআর