সাভারের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মাহমুদুল হাসান। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে খরচ বাঁচাতে তিনি সাভারের আশুলিয়া এলাকায় বসবাস করছেন। বাসায় লাইনের গ্যাস সংযোগ না থাকায় রান্নার একমাত্র ভরসা এলপিজি সিলিন্ডার।
কিন্তু সম্প্রতি এলপিজি কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। সাভারের আশুলিয়া বাজারে গিয়ে জানতে পারেন, সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হলেও দোকানদার তার কাছে ১ হাজার ৮০০ টাকা দাবি করছেন। বিকল্প না থাকায় শেষ পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫৪৭ টাকা বেশি দিয়েই সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হন মাহমুদ।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাসায় গ্যাস সংযোগ নেই, এলপিজি ছাড়া রান্নার উপায়ও নেই। দোকানে এসে শুনি ১ হাজার ২৫৩ টাকার সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ টাকা। বাধ্য হয়ে কিনেছি। এসব দেখার কি কেউ নেই? দায় কার?
মাহমুদুল হাসান একা নন। সাভার, আশুলিয়া, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বহু বাসিন্দাই একই অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন। গ্যাস সংযোগ না থাকায় এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো হঠাৎ অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর বাজার এলাকার বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, চারটি দোকান ঘুরেছি, সব জায়গায় একই দাম- ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে দুই হাজার টাকায় কিনেছি।”
শুক্রবার সকালে স্যোশাল মিডিয়ায় অনেক গ্রাহকই এর প্রতিবাদ স্বরূপ লেখালেখি করছেন। অনেকেরই বক্তব্য দেড় মাস আগে যে সিলিন্ডার তিনি ১ হাজার ৩৫০ টাকায় কিনেছিলেন, সেটির দাম এখন দোকানদার বলছেন ২ হাজার ৫০০ টাকা। একই সঙ্গে তিনি জানান, অনেক দোকানেই সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
অনেকে আবার লিখেছেন, নীরবে সিলিন্ডার গ্যাসের হরিলুট চলছে। এক হাজার ৩০০ টাকার বোতল এখন ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সাভার ও আশুলিয়া এলাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক দোকানে আবার চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডারই নেই।
আশুলিয়া এলাকার এক সিলিন্ডার বিক্রেতা বলেন, বর্তমানে বাজারে সিলিন্ডারের সংকট রয়েছে। আমাদেরও ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন খরচ যোগ হওয়ায় বিক্রির দাম বাড়ছে। ইচ্ছা করে বেশি নিচ্ছি না।”
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। ডিসেম্বর মাসে ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ভোক্তা পর্যায়ে ১ হাজার ২৫৩ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী এই দাম আগামী ৪ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা।
কিন্তু কোনো নতুন ঘোষণা ছাড়াই সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তারা প্রশ্ন তুলছেনএই দায় কার?
ব্যবসায়ীদের দাবি, সময়মতো এলসি খুলতে না পারায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি হয়নি, ফলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।
তবে জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে থাকা এলপিজি আগেই আমদানি করা। নতুন দামের ঘোষণাও আসেনি। তাহলে হঠাৎ এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণ কী?
ওমেরা এলপিজির ডিরেক্টর ড. এম তামিম গণমাধ্যমকে বলেন, আমি সকালে পত্রিকায় দেখে হঠাৎ দাম বাড়ার বিষয়টি জানতে পারি। ডিটেইল জানি না, আই হ্যাভ নো আইডিয়া। সরবরাহ ঘাটতির কারণে হয়তো এমনটা হচ্ছে। ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ের তারতম্যের কারণে এমনটা হতে পারে।”
বিইআরসির এক কর্মকর্তা জানান, সরবরাহ ঘাটতির কারণে দাম বেড়েছে। বিষয়টি নজরে আসায় এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং ভোক্তা অধিদপ্তরকে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন,
সুযোগ বুঝে ব্যবসায়ীরা লুণ্ঠন করছে। এই লুণ্ঠন রোধের দায়িত্ব বিইআরসি, ভোক্তা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের। কিন্তু কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই।
তিনি আরও বলেন, আইনে বলা আছে- নির্ধারিত দামের বেশি নিলে জরিমানা ও জেল হতে পারে। কিন্তু কখনো এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়নি। তাহলে দেশ কীভাবে চলে?”
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন দাম বৃদ্ধিকে বিইআরসির ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এলপিজি একটি ক্রিটিক্যাল আইটেম। সরবরাহে ঘাটতি হবে কি না- এটা বিইআরসির জানা থাকার কথা। নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রি মোটেও কাম্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, যেখানে অনিয়ম হচ্ছে, সেখানে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বড় আউটলেট তৈরি করে হলেও সাধারণ মানুষকে ন্যায্য দামে এলপিজি দিতে হবে।
নতুন কথা/এএস
নিজস্ব প্রতিবেদক: 



















