ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ছয় দিন বাকি। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই তীব্র হচ্ছে নির্বাচনি প্রচারণা। রাজধানীসহ সারা দেশে বইছে ভোটের আমেজ। প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। ভোট চাইতেও তারা পিছপা নন। তবে এই প্রচারণার আড়ালেই প্রকাশ্যভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে নির্বাচনি আইন ও আচরণ বিধিমালা।
নির্বাচনি বিধি থাকলেও তা মানার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না কোনো দলের মধ্যেই। তৃণমূল থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের প্রার্থীরাও নিয়ম ভাঙছেন অবাধে। নিষিদ্ধ মাইক ব্যবহার করে নগরীর অলিগলি চষে বেড়ানো, পিভিসি ও সিনথেটিক ব্যানারে শহর ঢেকে ফেলা এখন নিত্যদিনের চিত্র। আইন যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেদারসে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ প্রচারসামগ্রী। অলিগলি, বৈদ্যুতিক খুঁটি, সরকারি ভবনের দেয়াল, ফুটপাত এমনকি সড়কের মাঝখানেও ঝুলছে পিভিসির তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুন। এতে একদিকে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে ঘটছে আচরণ বিধিমালার প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আচরণ বিধিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। লিফলেট ও ব্যানারের ক্ষেত্রেও আরোপ করা হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। আচরণ বিধিমালার ১৭ ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে, দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে। একই ধারার ১ উপধারায় নির্ধারণ করা হয়েছে, একসঙ্গে তিনটির বেশি মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যাবে না।
আইনে আরও বলা হয়েছে, প্রচারণায় পলিথিন, প্লাস্টিক, রেকসিন বা অন্য কোনো অপচনশীল দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ। দেয়াল, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা সরকারি-বেসরকারি যানবাহনে লিফলেট বা ফেস্টুন লাগানো যাবে না। ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া ব্যবহৃত ব্যানার ও ফেস্টুন হতে হবে সাদা-কালো রঙের। ব্যানারের সর্বোচ্চ মাপ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট এবং ফেস্টুনের মাপ ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যানারে প্রার্থীর ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না। দেয়ালে লেখা, অঙ্কন কিংবা গেট-তোরণ নির্মাণও নিষিদ্ধ।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, সায়েন্সল্যাব, আগারগাঁও, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভিআইপি প্রার্থীরাই এসব বিধি লঙ্ঘনে এগিয়ে। বিভিন্ন আসনে পিভিসি দিয়ে তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যাপক হারে টানানো হয়েছে।
আগারগাঁও এলাকায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ববি হাজ্জাজের পিভিসি ফেস্টুন চোখে পড়েছে। একই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও ১১-দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী মামুনুল হকের পোস্টার দেখা গেছে মোহাম্মদপুর এলাকায়। সায়েন্সল্যাব গোলচত্বরে ঝুলছে প্রার্থীদের বড় আকারের নির্বাচনি বিলবোর্ড।
ঢাকা-১২ আসনে আগারগাঁওয়ের পরিকল্পনা কমিশনের পাশের বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলতে দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলনের পিভিসির তৈরি ফেস্টুন। একই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হকও বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ পিভিসি ব্যানার ব্যবহার করে প্রচার চালাচ্ছেন।
ঢাকা-১০ আসনেও একই চিত্র। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেখ রবিউল আলম, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জসীম উদ্দিন সরকার এবং জনতার দলের প্রার্থী মেজর (অব.) জাকির হোসেনের প্রচারণায় ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট ও পলাশী এলাকায় ঝুলছে নিষিদ্ধ পিভিসি ব্যানার।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ফেস্টুন ও ব্যানার সাদা-কালো হওয়ার কথা। কেউ যদি পিভিসি ব্যবহার করে থাকে, তাহলে সেটি আচরণ বিধিমালার লঙ্ঘন। বিষয়টি চোখে পড়লে নির্বাচন ট্রাইব্যুনাল ইনকোয়ারি কমিটি, অ্যাডজুডিকেশন কমিটি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের জানানো যেতে পারে।
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান বলেন, নির্বাচন কমিশন বারবার বিধিমালার কথা বলছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বড় আকারের ব্যানারগুলো আইনসম্মত কি না, তা সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারছে না। তিনি বলেন, বিষয়টি কোনো একক দলের নয়। জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি সহ প্রায় সব দলই নিয়ম ভেঙে প্রচারণা চালাচ্ছে।
তার মতে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল এসব অবৈধ ব্যানার ও পোস্টার দ্রুত অপসারণ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত আদৌ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
নতুন কথা/এসআর
শারমিন রহমান: 



















