ঢাকা ০৭:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকায় নিজ বাসা থেকে জামায়াত নেতার মরদেহ উদ্ধার ত্বকের বলিরেখা কমাতে যেসব প্রাকৃতিক তেল হতে পারে ভরসা ভারতের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ আইসিসির, অবস্থানে অটল বিসিবি ইরানে নজিরবিহীন বিক্ষোভে নিহত প্রায় ২ হাজার মানুষ: সরকারি কর্মকর্তা বিএনপি নেতা ডাবলুর মৃত্যু: অভিযানে অংশ নেওয়া সব সেনাসদস্য প্রত্যাহার, তদন্ত কমিটি গঠন জ্বালানি সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ, তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সরকার: সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা : সালাহউদ্দিন আহমদ সবোজলাইয়ের নায়ক-খলনায়ক রাতেও বার্নসলিকে উড়িয়ে চতুর্থ রাউন্ডে লিভারপুল জীবনদর্শনের দূরত্বেই ফাটল: যে কারণে টেকেনি তাহসান-রোজার সংসার শিক্ষা শুধু চাকরির কারখানা নয়, সৃজনশীল মানুষ গড়ার পথ: প্রধান উপদেষ্টা

শহীদ হাদীর মৃত্যু, নৈরাজ্যের রাজনীতি এবং নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েমের অশনিসংকেত

  • আহমেদ শাহেদ
  • আপডেট সময় ০১:২২:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৩৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে শরীফ ওসমান বিন হাদীর মৃত্যু একটি গভীর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, কোনো স্বাভাবিক মৃত্যুও নয়- বরং এটি এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল, যেখানে ভিন্নমত, ন্যায়বিচারের দাবি এবং রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই হয়ে উঠেছিল অপরাধ। রাষ্ট্রের নীরবতা, প্রশাসনিক অস্পষ্টতা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের অভাবই প্রমাণ করে- এই মৃত্যুকে ঘিরে অনেক অস্বস্তিকর সত্য আজও আড়ালেই রয়ে গেছে।

তবে আরও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো- শহীদ হাদীর এই মৃত্যু এখন একটি বিশেষ মহলের কাছে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তার আত্মত্যাগকে সম্মান জানানোর বদলে, একটি সংঘবদ্ধ শক্তি এটিকে ব্যবহার করছে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এবং সর্বোপরি- নতুন এক ফ্যাসিবাদী বাস্তবতা তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য।

শরীফ ওসমান বিন হাদী ছিলেন এমন একজন রাজনৈতিক কর্মী, যার রাজনীতি ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং মানুষের অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। তার বক্তব্য, লেখালেখি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়-তিনি কোনো দলীয় সংকীর্ণতার প্রতিনিধি ছিলেন না। বরং তিনি প্রতিনিধিত্ব করতেন একটি নৈতিক রাজনীতির, যেখানে রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক, আইন হবে সবার জন্য সমান এবং ক্ষমতা হবে জনগণের হাতে ন্যস্ত।

হাদীর রাজনৈতিক দর্শনে তিনটি বিষয় বারবার উঠে আসে-
* ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা,
* রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ,
* গণমানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।

এখানে লক্ষণীয় যে, তিনি কখনোই সহিংস বিপ্লব, রাষ্ট্র ধ্বংস বা নৈরাজ্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেননি। বরং তার আন্দোলনের ভাষা ছিল যুক্তিনির্ভর, তার কর্মসূচি ছিল সাংগঠনিক এবং তার লক্ষ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তার মৃত্যুর পর যে ধরনের সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড দেখা যাচ্ছে, তা তার রাজনৈতিক দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

হাদীর মৃত্যুকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো- রাষ্ট্র কেন এখনো একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি? মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিবৃতি, নাগরিক সমাজের প্রশ্ন এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়- এই মৃত্যুর পেছনে রাষ্ট্রীয় অবহেলা কিংবা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ দমননীতির ভূমিকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি- ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রায়শই ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বা ‘দুর্ঘটনা’ শব্দ ব্যবহার করেছে, যা পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শহীদ হাদীর মৃত্যুও সেই ধারার বাইরে নয়।

কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করে যদি এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তা প্রকৃত বিচারের পথকে আরও জটিল করে তোলে- এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

রাজনীতিতে একটি বহুল আলোচিত তত্ত্ব আছে- “Chaos benefits authoritarianism”। অর্থাৎ, বিশৃঙ্খলা সবসময় স্বৈরাচারী শক্তির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে মিসর, সিরিয়া কিংবা এমনকি ইউরোপের কিছু রাষ্ট্রেও দেখা গেছে- গণআন্দোলনের পর সৃষ্ট অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে আরও কঠোর শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে।

বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অতীতে একাধিকবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে সামরিক কিংবা বেসামরিক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামল ছিল তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ-যেখানে ‘স্থিতিশীলতা’ ও ‘উন্নয়ন’-এর নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থা ও বিচার বিভাগকে ধ্বংস করা হয়েছে।

আজ যারা হাদীর মৃত্যুকে ব্যবহার করে নৈরাজ্য ছড়াচ্ছে, তারা কার্যত সেই একই রাজনৈতিক স্ক্রিপ্ট পুনরাবৃত্তি করছে।

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। এটি ছিল দলীয় সীমার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ- ফ্যাসিবাদ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে। এই অভ্যুত্থানের শক্তি ছিল তার নৈতিক বৈধতা এবং জনসম্পৃক্ততা।

কিন্তু এই অভ্যুত্থান যতটা শক্তিশালী, ততটাই বিপজ্জনক ফ্যাসিবাদী শক্তির জন্য। তাই ইতিহাসের নিয়ম মেনেই এই আন্দোলনকে ‘বিশৃঙ্খল’, ‘সহিংস’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ প্রমাণ করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। শহীদ হাদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নৈরাজ্য সেই প্রচেষ্টাকে জোরদার করছে।

ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভ্রান্ত বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে- গণআন্দোলন মানেই অস্থিরতা, আর অস্থিরতার সমাধান মানেই কঠোর শাসন।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এই নৈরাজ্যের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী কারা? উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। ইতিহাস বলে, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ বারবার টিকে ছিল ভয় ও বিশৃঙ্খলার বয়ানের ওপর। ‘আমি না থাকলে দেশ জ্বলে যাবে’-এই মনস্তত্ত্বই ছিল তার শাসনের মূল ভিত্তি।

আজ যারা হাদীর নাম ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করছে, তারা হয়তো বুঝে বা না বুঝে সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদী বয়ানকেই শক্তিশালী করছে। জনগণ যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখন তারা স্বাধীনতার চেয়ে ‘শক্ত হাতে শাসন’-কে গ্রহণযোগ্য মনে করতে শুরু করে।

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ তার নাম ব্যবহার করে অরাজকতা সৃষ্টি করা নয়। বরং তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হলো-

* তার আদর্শকে সঠিকভাবে তুলে ধরা
* তার মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো করা
* গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করা
* এবং যেকোনো রূপের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা

হাদী ছিলেন বিবেকের রাজনীতির প্রতীক। তার আত্মত্যাগ যদি নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়, তবে তা শুধু তার সঙ্গে নয়- সমগ্র জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে।

বাংলাদেশ আজ একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময়ে আবেগ নয়, প্রজ্ঞাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। শহীদের রক্ত আমাদের পথ দেখায়- কিন্তু সেই পথ যদি নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে তা মুক্তির নয়, বরং নতুন দাসত্বের দিকেই নিয়ে যায়।

শহীদ হাদীর স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ইনসাফ কখনো নৈরাজ্যের সন্তান হতে পারে না। আর ফ্যাসিবাদ, তা যত নতুন পোশাকই পরুক না কেন, শেষ পর্যন্ত চিনে নেওয়াই নাগরিক দায়িত্ব।

 

লেখক: একজন কলামিস্ট ও গণমাধ্যমকর্মী।

ঢাকায় নিজ বাসা থেকে জামায়াত নেতার মরদেহ উদ্ধার

শহীদ হাদীর মৃত্যু, নৈরাজ্যের রাজনীতি এবং নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েমের অশনিসংকেত

আপডেট সময় ০১:২২:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে শরীফ ওসমান বিন হাদীর মৃত্যু একটি গভীর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, কোনো স্বাভাবিক মৃত্যুও নয়- বরং এটি এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল, যেখানে ভিন্নমত, ন্যায়বিচারের দাবি এবং রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই হয়ে উঠেছিল অপরাধ। রাষ্ট্রের নীরবতা, প্রশাসনিক অস্পষ্টতা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের অভাবই প্রমাণ করে- এই মৃত্যুকে ঘিরে অনেক অস্বস্তিকর সত্য আজও আড়ালেই রয়ে গেছে।

তবে আরও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো- শহীদ হাদীর এই মৃত্যু এখন একটি বিশেষ মহলের কাছে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তার আত্মত্যাগকে সম্মান জানানোর বদলে, একটি সংঘবদ্ধ শক্তি এটিকে ব্যবহার করছে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এবং সর্বোপরি- নতুন এক ফ্যাসিবাদী বাস্তবতা তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য।

শরীফ ওসমান বিন হাদী ছিলেন এমন একজন রাজনৈতিক কর্মী, যার রাজনীতি ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং মানুষের অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। তার বক্তব্য, লেখালেখি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়-তিনি কোনো দলীয় সংকীর্ণতার প্রতিনিধি ছিলেন না। বরং তিনি প্রতিনিধিত্ব করতেন একটি নৈতিক রাজনীতির, যেখানে রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক, আইন হবে সবার জন্য সমান এবং ক্ষমতা হবে জনগণের হাতে ন্যস্ত।

হাদীর রাজনৈতিক দর্শনে তিনটি বিষয় বারবার উঠে আসে-
* ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা,
* রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ,
* গণমানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।

এখানে লক্ষণীয় যে, তিনি কখনোই সহিংস বিপ্লব, রাষ্ট্র ধ্বংস বা নৈরাজ্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেননি। বরং তার আন্দোলনের ভাষা ছিল যুক্তিনির্ভর, তার কর্মসূচি ছিল সাংগঠনিক এবং তার লক্ষ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তার মৃত্যুর পর যে ধরনের সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড দেখা যাচ্ছে, তা তার রাজনৈতিক দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

হাদীর মৃত্যুকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো- রাষ্ট্র কেন এখনো একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি? মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিবৃতি, নাগরিক সমাজের প্রশ্ন এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়- এই মৃত্যুর পেছনে রাষ্ট্রীয় অবহেলা কিংবা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ দমননীতির ভূমিকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি- ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রায়শই ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বা ‘দুর্ঘটনা’ শব্দ ব্যবহার করেছে, যা পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শহীদ হাদীর মৃত্যুও সেই ধারার বাইরে নয়।

কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করে যদি এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তা প্রকৃত বিচারের পথকে আরও জটিল করে তোলে- এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

রাজনীতিতে একটি বহুল আলোচিত তত্ত্ব আছে- “Chaos benefits authoritarianism”। অর্থাৎ, বিশৃঙ্খলা সবসময় স্বৈরাচারী শক্তির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে মিসর, সিরিয়া কিংবা এমনকি ইউরোপের কিছু রাষ্ট্রেও দেখা গেছে- গণআন্দোলনের পর সৃষ্ট অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে আরও কঠোর শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে।

বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অতীতে একাধিকবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে সামরিক কিংবা বেসামরিক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামল ছিল তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ-যেখানে ‘স্থিতিশীলতা’ ও ‘উন্নয়ন’-এর নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থা ও বিচার বিভাগকে ধ্বংস করা হয়েছে।

আজ যারা হাদীর মৃত্যুকে ব্যবহার করে নৈরাজ্য ছড়াচ্ছে, তারা কার্যত সেই একই রাজনৈতিক স্ক্রিপ্ট পুনরাবৃত্তি করছে।

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। এটি ছিল দলীয় সীমার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ- ফ্যাসিবাদ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে। এই অভ্যুত্থানের শক্তি ছিল তার নৈতিক বৈধতা এবং জনসম্পৃক্ততা।

কিন্তু এই অভ্যুত্থান যতটা শক্তিশালী, ততটাই বিপজ্জনক ফ্যাসিবাদী শক্তির জন্য। তাই ইতিহাসের নিয়ম মেনেই এই আন্দোলনকে ‘বিশৃঙ্খল’, ‘সহিংস’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ প্রমাণ করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। শহীদ হাদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নৈরাজ্য সেই প্রচেষ্টাকে জোরদার করছে।

ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভ্রান্ত বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে- গণআন্দোলন মানেই অস্থিরতা, আর অস্থিরতার সমাধান মানেই কঠোর শাসন।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এই নৈরাজ্যের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী কারা? উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। ইতিহাস বলে, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ বারবার টিকে ছিল ভয় ও বিশৃঙ্খলার বয়ানের ওপর। ‘আমি না থাকলে দেশ জ্বলে যাবে’-এই মনস্তত্ত্বই ছিল তার শাসনের মূল ভিত্তি।

আজ যারা হাদীর নাম ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করছে, তারা হয়তো বুঝে বা না বুঝে সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদী বয়ানকেই শক্তিশালী করছে। জনগণ যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখন তারা স্বাধীনতার চেয়ে ‘শক্ত হাতে শাসন’-কে গ্রহণযোগ্য মনে করতে শুরু করে।

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ তার নাম ব্যবহার করে অরাজকতা সৃষ্টি করা নয়। বরং তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হলো-

* তার আদর্শকে সঠিকভাবে তুলে ধরা
* তার মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো করা
* গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করা
* এবং যেকোনো রূপের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা

হাদী ছিলেন বিবেকের রাজনীতির প্রতীক। তার আত্মত্যাগ যদি নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়, তবে তা শুধু তার সঙ্গে নয়- সমগ্র জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে।

বাংলাদেশ আজ একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময়ে আবেগ নয়, প্রজ্ঞাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। শহীদের রক্ত আমাদের পথ দেখায়- কিন্তু সেই পথ যদি নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে তা মুক্তির নয়, বরং নতুন দাসত্বের দিকেই নিয়ে যায়।

শহীদ হাদীর স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ইনসাফ কখনো নৈরাজ্যের সন্তান হতে পারে না। আর ফ্যাসিবাদ, তা যত নতুন পোশাকই পরুক না কেন, শেষ পর্যন্ত চিনে নেওয়াই নাগরিক দায়িত্ব।

 

লেখক: একজন কলামিস্ট ও গণমাধ্যমকর্মী।